গার্মেন্টকর্মী ও তার অন্তর্ধানআত্মা

গার্মেন্টকর্মী ও তার অন্তর্ধানআত্মা
-কাজী সাইফুল ইসলাম

আশা/
মাকে বলেছিলাম-
ঈদের ছুটিতেই বাড়ি ফিরবো এবার
কতো দিন দেখা হয় না মাকে, আর নীলাকেও
আমার এই কষ্টের কপাল দেখে-
নিশুতি রাতে মিহিসুরে কাঁদে মা, আর নীলা থাকে অপেক্ষায়-
ওদের কাউকেই আর বোঝাতে পারি না আমি
গাড়ি ভাড়াও যে বেড়েছে অনেক গুন
গার্মেন্টের চাকরি- তিন হাজার টাকা বেতন
দু’টি নিরিহ প্রাণির খাওয়াপড়া , সৌখিন নয়-
চিড় ধরা মাটির ঘর আর চোখের সামনে ক্ষুধার কঠিন দানব থাকে আঁকা!
ব-হু পুরনো আস্তর খোলা ছোট্ট দালানের-
নিচে পড়ে থাকা গাড়িঘরটিতে ঠাঁই মিলেছে আমার
চারটি নড়বড়ে চোকি আর এক চিলতে মেঝে
রাত হলেই টের পাই, শহরের গলিঘুঁজিতে অনাথ কুকুরের দল
খাবার খুঁজে বেড়ায়-আমারই মতো!
ষাট বোল্টের টিমটিমে জ্বলে থাকা একটি বাতি, অসহ্য গরম-
হাতপাখার দাপাদাপি, আর-
গরিবের রক্তে মাসাদের উল্লাস!
শীত নামলে তবুও শান্তি মেলে কিছুটা
মাথার উপরের আস্তার খোলা ছাদে জমাট বাঁধা-
লালটকটকে সুরকিগুলোর অট্টহাসি
পলস্তরা ঘসা দেয়ালের লোনাদাগ, সেঁতসেঁতে মেঝে
একটু বৃষ্টি হলেই চাপচুপ! বড় উপহাস করে আমায়-
তবুও আশাগুলো বেঁধে রাখি শক্তসুতোয়!

আক্ষেপ/
কাঁদার নরম সেই থকথকে শব্দ, লাল জমে থাকা সন্ধ্যা, আর
বুড়ো সেওড়ার ঝোপ থেকে এখন আমি অনেক দূরে
মাসে পাঁচাত্তর টাকার আকিজ বিড়ি, আর পুরনো কিছু বই
একটি বুক সেল্ভও কেনা হয় নি এখনও
আমাদের রুমের বাকি তিন জন বই পড়ে না-
শুধু নেড়েচেড়ে দেখে আর উপহাস করে!
বিড়ম্বিত ভাগ্যের সাথে পথ খুঁজি রাতভর-
আমি আর শতসহস্র আত্ম জড়সড় হয়ে পড়ে থাকি
আমারই ছোট চোকিতে-
বইয়ে আঁকাঝোক এক-একটি চরিত্র তখন হয়ে ওঠে এক-একটি জীবন্ত আতœা!
মাসে চল্লিস, পঁয়তাল্লিশ অথবা পঁঞ্চাশও যায় পুরনো বই কিনে, আর
পঁচাত্তর টাকার বিড়ি, ওইই আমার হাত খরচ!
সংবেদনার চুরান্ত অক্ষেপ লেপটে থাকে বুকের ভেতর-
ভালবাসি- এই কথাটা এখনও বুকউঁচিয়ে বলা হয় নিই নীলাকে
মা অপেক্ষায় থাকে, এবার ছুটিতে বাড়ি ফিরলেই বিয়ে দেবে আমায়
হয়তো নীলাও পথ চেয়ে থাকে, আশা আর ভালবাসায়
পথগুলো কেমন দীর্ঘ হতেহতে ওদের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ টের পাই আমি
জীবনের এই সব আয়োজন ব্যকুলতা আর অপেক্ষা- গভীর
অনুশোচনার নীল আগুনে পোড়ায় আমায়
শুনেছি, অকেশনগুলোতে মা অপেক্ষা করে থাকে চোখে পানি নিয়ে, আর ওর হাতে থাকে বনফুল
কিছুতেই বোঝাতে পারি না, যাওয়াআসার গাড়ি ভাড়া, আর-
দু’জনের জন্য দু’টি ঢাকাইশাড়ি-
আর যে কিছুই বাকি থাকে না বেতনের। আরো কতো কি যে কিনতে ইচ্ছে করে!
তার পর, তার পর- সারা মাস রইতে হয় অভুক্ত!
উহু! কি নিষ্ঠুর এই ক্ষুধা-

বিদায়/

কিছুই হলো না আর!
ছাদের শক্ত ফিম পড়েছিল মাথায়- আমি তো বেঁচেই গেলাম
তোমাদের কি হবে মা!
নীলা হয়তো মনে রাখবে কিছুকাল, কাঁদবে আবার হাসবে
তার পর চিকন লম্বা একখান দাগ ফেলে রাখবে হৃদয়ে, আর
মুখ গুজে নেবে কোন না কোন পুরুষের বুকে, তুমি!
কে দেখবে তোমায়-
জানি বিধাতা নিষ্ঠুর হবে না,
আমাকে মাপ করো, কিছুই তো আর দেখা হলো না আমার
তোমার মুখের হাসি আর নীলাকে নতুন শাড়িতে!

0
0
  

বাংলায় মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না *

*


*

বাংলায় লেখার জন্য Phonetic এ ক্লিক করুন

Protected by WP Anti Spam